বিবিসি স্পোর্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১১৫টি অভিযোগের বেশিরভাগেই ম্যানচেস্টার সিটি দোষী সাব্যস্ত হলেও প্রিমিয়ার লিগ কর্তৃপক্ষ ও ক্লাবগুলো আপাতত তাদের অতীতের শিরোপা কেড়ে নেওয়ার ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী নয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিটির মামলায় বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি হলো, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত অভিযুক্ত নিয়মভঙ্গের সময়কালে ক্লাবটি যে শিরোপাগুলো জিতেছে সেগুলো কেড়ে নেওয়া হবে কি না।

জানা গেছে, প্রিমিয়ার লিগ কর্তৃপক্ষ হোক বা ক্লাবগুলো, কেউই এখন সিটির অতীতের শিরোপা কেড়ে নেওয়ার ব্যাপারে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না। তবে বিষয়টি এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। স্বাধীন কমিশন এখনো শাস্তি নির্ধারণী শুনানি করেনি, এবং চূড়ান্ত শাস্তির সিদ্ধান্ত কমিশনই নেবে।

প্রিমিয়ার লিগের বর্তমান নিয়মে স্পষ্টভাবে উল্লিখিত শাস্তির মধ্যে রয়েছে জরিমানা, পয়েন্ট কর্তন এবং লিগ থেকে বহিষ্কার, তবে একই সঙ্গে শৃঙ্খলা কমিশনকে উপযুক্ত মনে হলে অন্য যেকোনো শাস্তি দেওয়ার অনুমতিও দেওয়া হয়েছে। তাই নিয়মের দিক থেকে ভূতাপেক্ষভাবে পয়েন্ট কর্তন, এমনকি শিরোপা কেড়ে নেওয়ার সম্ভাবনাও রয়ে গেছে।
তবে শিরোপা কেড়ে নেওয়ার তুলনায় পয়েন্ট কর্তন, বিপুল অঙ্কের জরিমানা, এমনকি প্রিমিয়ার লিগ থেকে বহিষ্কারকেই বেশি বাস্তবসম্মত শাস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রায় দুই বছর আগে মরিনহো সিটির মামলা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে রসিকতা করে বলেছিলেন, তার অধীনে থাকা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এখনো ২০১৭-১৮ মৌসুমের প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জেতার সুযোগ আছে। সেই মৌসুমে ইউনাইটেড সিটির চেয়ে ১৯ পয়েন্ট পিছিয়ে দ্বিতীয় হয়েছিল।
মরিনহো তখন বলেছিলেন: 'আমার মনে হয় সেই লিগ শিরোপা জেতার আশা আমাদের এখনো আছে... তাহলে ওদের আমাকে বোনাস দিতে হবে, আর পদকটাও দিতে হবে।'
সিটির অভিযুক্ত নিয়মভঙ্গের সময়কালে জেতা শিরোপাগুলো যদি পুনর্বণ্টন করা হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট রানার্সআপ দলগুলো হলো: প্রিমিয়ার লিগে ২০১১-১২ ও ২০১৭-১৮ মৌসুমের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, এবং ২০১৩-১৪ মৌসুমের লিভারপুল।
এছাড়া রয়েছে এফএ কাপে স্টোক সিটি, লিগ কাপে সান্ডারল্যান্ড, লিভারপুল ও আর্সেনাল, এবং কমিউনিটি শিল্ডে চেলসি।
শিরোপা পুনর্বণ্টন ধারাবাহিক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে
বিবিসির মতে, যদি ভূতাপেক্ষভাবে শিরোপা পুনর্বণ্টন শুরু হয়, তবে একের পর এক জটিল প্রশ্ন দেখা দেবে।
উদাহরণস্বরূপ, চেলসির বিরুদ্ধেও এর আগে ২০১১ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে কিছু দলবদলে এজেন্টদের গোপনে অর্থ প্রদানের বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছিল। ফলে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন: সিটিকে যদি ভূতাপেক্ষ শাস্তি পেতে হয়, তাহলে অতীতে নিয়মভঙ্গকারী অন্যান্য ক্লাবের ক্ষেত্রেও কি একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা উচিত নয়?
তাছাড়া সিটির নিয়মভঙ্গ প্রতিযোগিতার মাঠে ঠিক কতটা সুবিধা এনে দিয়েছিল, তা সঠিকভাবে নির্ধারণ করা কঠিন। আর্থিক নিয়ম পুরোপুরি মেনে চললে সিটি তখন কোন কোন খেলোয়াড়কে সই করাতে পারত না, সেটাও নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
আরেকটি প্রশ্ন হলো শাস্তির সময়সীমা। সিটির বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রিমিয়ার লিগের তদন্তে সহযোগিতা না করার অভিযোগও ছিল। এই সময়ে লিভারপুল ২০১৮-১৯ ও ২০২১-২২ মৌসুমে মাত্র ১ পয়েন্টের ব্যবধানে প্রিমিয়ার লিগে রানার্সআপ হয়েছিল।
ক্লপও এর আগে রসিকতা করে বলেছিলেন, ভবিষ্যতে লিভারপুলকে যদি সেই শিরোপাগুলো দেওয়া হয়, তবে তিনি নিজের বাগানে পার্টি দেবেন।
বিবিসি উল্লেখ করেছে, যদি মনে করা হয় যে ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের নিয়মভঙ্গই সিটির পরবর্তী সাফল্যের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে, তাহলে ২০১৮ সালের পর গার্দিওলার অধীনে জেতা শিরোপাগুলোও শাস্তির আওতায় আসবে কি না, সেই সীমারেখা টানাও কঠিন একটি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে।
ফুটবল ইতিহাসে শিরোপা কেড়ে নেওয়ার নজির আছে
প্রিমিয়ার লিগে এর আগে এমন কোনো নজির না থাকলেও অন্যান্য প্রতিযোগিতায় শিরোপা কেড়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
'ক্যালসিওপোলি' কেলেঙ্কারির পর জুভেন্টাসের কাছ থেকে ২০০৪-০৫ ও ২০০৫-০৬ মৌসুমের সেরি আ শিরোপা কেড়ে নেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রথম শিরোপাটি শূন্য রাখা হয় এবং দ্বিতীয়টি ইন্টার মিলানকে দেওয়া হয়।
ইংলিশ ফুটবলেও এমন উদাহরণ আছে। এলগিন সিটি ১৯৯২-৯৩ মৌসুমে হাইল্যান্ড লিগ জেতার পর অযোগ্য খেলোয়াড় খেলানোর কারণে শিরোপা হারায়। অন্যান্য খেলায় এমন ঘটনা আরও বেশি দেখা যায়। যেমন, ডোপিং কেলেঙ্কারির কারণে ল্যান্স আর্মস্ট্রংয়ের সাতটি ট্যুর দ্য ফ্রান্স শিরোপা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
তবে পাতানো ম্যাচ, অযোগ্য খেলোয়াড় খেলানো বা ডোপিংয়ের তুলনায় আর্থিক নিয়মভঙ্গ ও মাঠের ফলাফলের মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক সরাসরি নির্ধারণ করা অনেক কঠিন, তাই সিটির মামলা অনেক বেশি জটিল।
শিরোপা কেড়ে নেওয়ার চেয়ে ক্ষতিপূরণ দাবিই বেশি বাস্তবসম্মত
জানা গেছে, একাধিক ক্লাব বর্তমানে আয়ের ক্ষতির জন্য সিটির কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করার কথা ভাবছে, এবং শিরোপা পুনর্বণ্টনের তুলনায় এই পথটিকেই বেশি সম্ভাব্য বলে মনে করা হচ্ছে।
একজন আইনজীবী বিবিসিকে বলেছেন, আসল প্রশ্ন হয়তো 'ক্লাবগুলো মামলা করতে পারবে কি না' সেটা নয়, বরং সম্ভাব্য দাবিদারদের পরিধি ঠিক কোথায় গিয়ে শেষ হবে সেটাই।
এর আওতায় শুধু শিরোপা হারানো, ইউরোপীয় প্রতিযোগিতার যোগ্যতা না পাওয়া বা অবনমিত হওয়া ক্লাবগুলোই নয়, বরং বোনাস, চুক্তি নবায়ন বা দলবদলের আয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খেলোয়াড়, কর্মী ও এজেন্টরাও আসতে পারেন। ওই আইনজীবী বলেন, পরিধি যদি ক্রমশ বাড়তে থাকে, তবে তা পুরো ফুটবল ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে স্বাধীন কমিশন শেষ পর্যন্ত যে শাস্তিই দিক না কেন, সিটির মামলাকে ঘিরে বিতর্ক ও আইনি লড়াই চলতেই থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
